লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী

Rate this post
লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী সম্পর্কে প্রায় আমরা সবাই জানি। তবে মূল বিষয় বা ঘটনা আমাদের অধিকাংশই জানে না। আর তাদের জানার জ্ঞাতেই আজকে আমরা লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনীর পুরো অংশ এবং সম্পূর্ণ ডিটেইলস আলোচনা করবো। বর্তমান যুগে এসেও আমরা আমাদের দেখা অনেকের প্রেম-ভালোবাসাকে লাইল-মজনু প্রেমের সাথে তুলনা করে থাকি। আর এই তুলনার কারণ কি বা কেন তুলনা করা হয়, তার সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশের মধ্যেই রয়েছে অজানা। তারই প্রেক্ষিতে আজকের আমাদের এই আর্টিকেল। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আজকের জানার চেষ্টা করবো লাইলি-মজনু কে ছিল? তাদের ‍ঘিরে থাকা পুরো কাহিনীটি কি? তাদের প্রেমের সূত্রপাত কিভাবে ঘটল? তাদের প্রেমের শেষে কি হলো ইত্যাদি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো। আলোচনা দীর্ঘায়িত না করে, চলুন তাহলে জানা যাক লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনীর ইন্টারেস্টিং গল্পটা। ( সাহাবীদের নাম সম্পর্কে জানুন এবং নবীর স্ত্রীগণের নাম জানুন )

লাইলি-মজনুর সম্পূর্ণ প্রেম কাহিনী

লাইলি-মজনুর সম্পূর্ণ প্রেম কাহিনী

বহুবছর পূর্বে আরব দেশে ছিল বনু আমির বেদুইন গোত্রের এক মহান শাসক, যার নাম ছিল সায়িদ। তিনি ছিলেন আরবে তখনকার অনেক ধনী লোক, যার ধন-দৌলত এতোটাই প্রচুর ছিল যে, আরব দেশে তাকে ধনাঢ্য সুলতান নামে অবিহিত করা হয়। অন্যদিকে তিনি ছিলেন দানশীলতায় অকৃত্রিম। মানুষদের প্রতি তাঁর ছিল প্রচুর ভালোবাসা ও মায়া। যে বিধায় সব সময় মানুষদেরকে দান-সহায়তা করে যেতেন। আর যে কারণে তাঁর কথা আরবের প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু এতো কিছুর পরেও তাঁর একটি বিষয়ে মনবিষন্ন ছিল। আর সেটি হলো তাদের কোনো বেবি বা বাচ্ছা নেই। যে কারণে তার পরিবারে ছিল এক ধরনের হতাশা। সে আল্লাহর নিকট নিয়মিত প্রার্থনা করে দোয়া করতেন এবং একটি সন্তান চাইতেন। ঠিক একইভাবে আল্লাহ তা’আলা তাদের মনের ভাসনা কবুল করে এবং তাদের সংসারে একটি সুন্দর ও ফুটফুটে ছেলে সন্তান দান করে। অত্যন্ত সুন্দর ও কোমল শিশুটির জন্মের পর বাদশা প্রজা ও সাধারণ মানুষদের নিকট টাকা পয়সা ও খাবার বিলাতে শুরু করেন। বাচ্চা দানের আনন্দে প্রজা সহ সকল স্তরের সাধারণ মানুষদের নিকট ছড়িয়ে পড়ে। অঞ্চলের সবার মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

শিশুটিকে দেখে-শুনে রাখার জন্য একজন দক্ষ ও সুন্দর পালিকা অথবা সেবিকা রাখা হয়। যাতে শিশুটিকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে লালন পালন করতে পারে। এছাড়াও কারো যাতে বদনজর না পড়ে, যে কারণে সব সময় শিশুটির কপালে একটি কালো গোল ছাপ দিয়ে রাখতো। এরপর শিশুটির নাম রাখা হয় কায়েস। যে আজকের গল্পের অর্থাৎ লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনীর প্রধান নায়েক।

ছোট কালের সৌন্দর্যের ধারাবাহিকতায় যত বড় হচ্ছে কায়েস ঠিক ততোই আরো সুন্দর ও সুঠম দেহ বিশিষ্ট হচ্ছে। তাঁর সৌন্দর্য যেন ক্রমান্বয়ে শুধু বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাঁর বয়স যখন সাত পূর্ণ হয়, তখন তাকে মাদ্রাসা তথা মুক্তবে প্রথম প্রথম পাঠানো হয়। তখন তাঁর গালে দাড়ির রেক তৈরি হয়। ধারাবাহিকভাবে ‍মুক্তবের মধ্যে সেরা ছাত্র হিসেবে ঘোষণা পায় কায়েস। সৌন্দর্য যেমন ঠিক তেমনি লেখাপড়ায়ও তাঁর অসামান্য প্রতিভাবান হয়ে উঠে।

কায়েস যে মাদ্রাসায় পড়তো, সে মাদ্রাসায় ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও পড়তো। সেখানো আরো অনেক মেয়ে ছিল তেমনি ছেলেও। সমগ্রভাবে সবাই মিলে-মিশে এক সাথে তাঁরা পড়তো। তবে এই মুক্তবে যে সমস্ত ছেলে-মেয়েরা পড়তো, সবাই ছিল ধনী ঘরের এবং সবাই ছিল সম্রান্ত। ধারাবাহিকভাবে তাদের পড়ালেখা চলছে। ঠিক কয়েকদিন পর তাদের সাথে নতুন একটি মেয়ে ভর্তি হলো। মেয়েটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও বিনয়ী ও আকর্ষণীয়। ঠিক প্রথম যখন মেয়েটিকে কায়েস দেখলো, তখন কায়েসের মনে হলো এমন সৌন্দর্যপূর্ণ মেয়ে কায়েস পূর্বে আর কখনো দেখে নি। তাদের উভয়ের বয়স তখন প্রায় সেইম। তবে এখনো বয়সের দ্ধার ১০ এর নিম্নে ছিল।

আর সেই মেয়েটির নাম ছিল লায়লা। লায়লা নামের অর্থ হলো রাত্রি বা রাত। যার পূর্ণ নাম ছিল লায়লা আল আমিরিয়া। তাঁর মায়াবতী চোখ, লম্বা চুল, সুঠম দেহ, এবং তাঁর অলস ও আকর্ষণীয় দৃষ্টি যেন যে কারো হৃদয় ছিন্ন-বিচিন্ন করে দিতে পারে মূহর্তেই। তাঁর কন্ঠ ছিল কোকিলের ন্যায়। গোলাপী রঙ্গের ঠোঁট সহ সব মিলিয়ে কায়েককে প্রচুরভাবে আকর্ষণ করে।

বলা চলে কায়েস যখন প্রথমবার তাকে দেখে, তখন থেকেই তার প্রেমে হাবু-ডাবু খাচ্ছে। তাকে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায় তাঁর। কায়েস লায়লার প্রেমে এতো পরিমাণ আসক্ত হয় যে তাকে নিয়ে কবিতা লিখা শুরু করে দেয়। প্রতিদিন, প্রতি মূহর্ত কায়েক লায়লাকে নিয়ে শুধু কবিতা লিখে। জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে সেই লিখিত কবিতাগুলো মানুষকে শোনাতো। কোনো কোনো মানুষজন কবিতা শুনতে না চাইলে, তাদেরকেও শোনাতো। এক কথায় কায়েস লায়লার জন্য দিওয়ানা হয়ে গেছে। প্রেমে হাবুডাবু খাচ্ছে। যে কারণে মানুষজন তাকে কায়েস ডাকা বন্ধ করে দিয়ে মাজনুন যার অর্থ দিওয়ানা বলা শুরু করে দেয়। আর বাংলা উচ্চারণ হচ্ছে মজনু। যে কারণে আমরা মজনু বলে থাকি।

এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পর মজনু সরাসরি লায়লার বাবার নিকট বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত লায়লার বাবা সাথে সাথে এই বিয়ের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করলো। কেননা লায়লার বাবা কোনো ধরনের পাগলের সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিতে চায় না। প্রকৃত পক্ষে মজনু কিন্তু পাগল ছিল না। সে লায়লার প্রেমে পাগলের ন্যায় এরকম আচরণ করতো। আর এটাকে লায়লার বাবা পাগল ভেবে তার নিকট লায়লার বিয়ে দিতে হেনেস্তা করলেন। বরং মজনু কে পাগল বলে সম্বোধন করলেন।

কিন্তু অপরপাশে লায়লাও কিন্তু মজনুকে বেশ ভালোবাসতো। কিন্তু পারিপার্শ্বিক কারণে সে এই কথা মজনুকে বলতে পারে নি। আর ঐ দিকে মজনুর কাছে বিয়ে না দিতে চেয়ে লায়লার বাবা লায়লার বিয়ে ধনী বৃদ্ধের নিকট ঠিক করে ফেলে। যাতে লায়লা মোটেও রাজি ছিল না। কিন্তু পরিবার এবং মান-সম্মানের দিকে নজর রেখে লায়লাকে জোর পূর্বক বৃদ্ধের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়।

আর এই খবর মজনু শুনে রাগে, ক্রোধে, হতশায় আর দুঃখে মজনু শহর-গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে মজনু বনে থাকা হিংস্র বিভিন্ন বণ্য প্রাণীদের সাথে থাকা শুরু করে। তবে জঙ্গলে গিয়েও মজনুর কবিতা লিখা বন্ধ হয় নি। সেখানেও মজনু লায়লাকে নিয়ে লিখছে নানা রকম কবিতা ও ছন্দ।

ঐদিকে লায়লা তাঁর বিবাহিত স্বামীকে মেনে নেয় নি। প্রায় সব সময় মজনুর জন্য কাঁদে। মাঝে মাঝে লায়লা পা দিয়ে লাথি মারতো বৃদ্ধকে।  যেহেতু জোর পূর্বক তাকে বুড়োর সাথে বিয়ে দিয়েছে, সেহেতু সেই বুড়ো লায়লার মন পায় নি। তবে ধনী, মান-সম্মান সম্পূর্ণ ও সম্রান্ত পরিবারের মেয়ে হওয়ায় ভালো ও দীক্ষ মেয়ে সেজে স্বামীর সংসার করছে।

অন্যদিকে মজনুর মা-বাবা তাঁর জন্য শোকে প্রায় মৃত্যু শয্যয় চলে গেছে। মজনু তাঁর মা-বাবাকে দেখার জন্য একবারও তাদের নিকট আসে নি। সে জঙ্গলে শুধু লায়লাকে নিয়েই কবিতা লিখছে। এখন সে বনে জঙ্গলে একাই একাই কবিতা আবৃত্তি করে। কাউকে পায় না বলে সে নিজেই লায়লাকে নিয়ে কবিতা লিখে, সে কবিতা নিজেই পড়ে। বালুতে বা মাটিতে লায়লাকে নিয়ে নানা ধরনের কল্পনার কাহিনী সহ কবিতা লিখতো।

কয়েক বছর পর মজনুর মা-বাবা উভয়ে মৃত্যুবরণ করে এবং সে খবর লায়লা নিজেই দিতে চেয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বামী ছিল অত্যন্ত চতুর। যে কারণে সে জঙ্গলে গিয়ে মজনুর সাথে দেখা করতে পারে না। আর তারই প্রেক্ষিতে লায়লা এক বৃদ্ধকে এই কাজের জন্য দায়িত্ব দেয়। বুড়ো একদিন জঙ্গলে গিয়ে মজনুকে এই খবর দিলে মজনু কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এভাবে অনেকক্ষণ কাঁদার পর সে পণ করে সে আর কোনোদিন শহর-গ্রামে আসবে না। বাকি জীবন বনে বনে কাটিয়ে দিবে।

সৌভাগ্যবশত, কিছুদিন পর লায়লার বৃদ্ধ স্বামীও মারা যায়। তখন লায়লা চেয়েছিল মজনুর নিকট চলে যেতে। অবশেষে লায়লা মনে করলো সর্বশেষ সে মজনুর সাথে বাকি জীবন কাটাতে পারবে। কিন্তু বেদুইন রীতি অনুযায়ী কোনো নারীর স্বামী মারা গেলে তাকে অন্তত দুই বছর ঘরেই থাকতে হবে এবং ঘরে বসে বসে তাঁর মৃত স্বামীর জন্য শোক পালন কতে হবে। অন্যথায় শাস্তির বিধান রয়েছে। যে বিধায় লায়লা আর ঘর থেকে বের হতে পারে নি।

কিন্তু এই দুই বছর লায়লা কিভাবে মজনুকে না দেখে থাকবে? সেই কারণে এবং শোকে লায়লা শোকে শোকে অবশেষে মারা যায় ঘরেই। যখন মজনু শুনতে পায় যে লায়লা মৃত্যুবরণ করেছে, তখন মজনু জঙ্গল হতে চলে আসে এবং কাঁদতে থাকে।

মজনু লায়লার কবরের পাশে বসে-শুয়ে কাঁদতে থাকে। এভাবে অনেকদিন কাঁদলো যতক্ষণ না তারও মৃত্যু হলো।  এভাবে লায়লার কবরের উপর মজনুর মৃত্যু হলো এবং লায়লার কবরের উপর পড়ে থাকলো মজনুর নিখর দেহ বিশেষ।

আর এভাবেই শেষ হলো লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী। যুগে যুগে আমরা এমন অনেক লায়লা-মজনুর গভীর প্রেম কাহিনীল সম্পর্ক দেখতে পাই। তাদের কেউ সফল হয় আবার কেউ অসফল থেকে যায়। যার কারো কারো ক্ষেত্রে মজনুর ন্যায় ঘটনাপ্রেক্ষাপটে শেষ হয়।

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে বিতর্কতা

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে বিতর্কতা

কিছু কিছু উৎস থেকে এটা জানা যায় যে, তাদের উভয়ের পিতা-মাতা তাদের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে এবং সর্বশেষ তাঁরা ভারতবর্ষে চলে আসে। কেউ কেউ বলে থাকে যে, ভারতের রাজস্থানে লায়লা মজনু চলে আসে এবং রাজস্থানের অনুপগড়ে তাদের মাজার রয়েছে।

আবার অনেকে বলে থাকে, লায়লা বৃদ্ধ স্বামী মজনুকে মারার জন্য লোকবল নিয়ে সেই জঙ্গলে রওনা দেয় এবং মজনুকে পেয়ে প্রচুর পরিমাণে মার-ধর করে। আবার অনেকে বলে থাকে, মজনুকে যদি কোনো আঘাত করা হয়, ম্যাজিক্যালি সেই সম-পরিমাণ আঘাত লায়লার গায়েও লাগে। এভাবে যখন লায়লার বৃদ্ধ স্বামী মজনুর বুকে মাঝে চুরি চালায়, তখন লায়লারও মৃত্যুবরণ হয়। পরে তাদের দুজনকে একসাথে কবর বা সমাধি করা হয়। এভাবে লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিতর্কিত আলোচনা।

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে শেষ কথা

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী নিয়ে শেষ কথা

প্রায় আমরা সবাই লাইলি মজনুর নাম শুনে থাকি, কিন্তু আমাদের অনেকে তাদের প্রেমের কাহিনী সম্পর্কে কিছুই জানি না। যে বিধায় আজকে আমরা এই আর্টিকেলের মাধ্যমে তাদের সম্পূর্ণ প্রেম কাহিনী সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছি। আশা করি আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে অধিকাংশ লাইলি আর মজনুর প্রেম কাহিনী সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।

মূলত এখানে প্রথম অংশে লাইলি-মজনুর প্রেম কাহিনী এবং লাস্ট অংশে তাদের নিয়ে বিতর্কিত কিছু আলোচনা উল্লেখ করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে যারা যারা লাইলি মজনু নাম শুনেছেন কিন্তু তাদের প্রেম কাহিনী নিয়ে কোনো কিছুই জানেন না, তারা আজকের আর্টিকেলটি দ্ধারা বেশ ভালোভাবে উপকৃত হয়েছেন।

লাইলি মজনুর প্রেম কাহিনী সম্পর্কে আরো জানতে

About রবীন্দ্র

Check Also

১ম থেকে ১৬তম শিক্ষক নিবন্ধন স্কুল ও কলেজ পর্যায় প্রশ্ন সমাধান

১ম থেকে ১৬তম শিক্ষক নিবন্ধন ( স্কুল ও কলেজ পর্যায় ) প্রশ্ন সমাধান

5/5 - (2 votes) বন্ধুরা আজকে আপনাদের মাঝে bdtoppost.com নিয়ে আসলো ১ম থেকে ১৬তম NTRCA …

Leave a Reply

Your email address will not be published.